স্টিভেন হকিং। নামটা আমরা সবাই জানি। বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত বিজ্ঞানী এবং পদার্থবিদ। আইনস্টাইন এর পরেই তাঁর নাম আসে। এই বিখ্যাত মানুষটির জীবনী নিয়ে আমাদের আজকের এই লেখা …

স্টিভেন হকিং ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি অক্সফোর্ডে জন্মগ্রহণ করেন। মজার ব্যাপার হল তাঁর জন্ম হয় বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলেইর মৃত্যুর ঠিক ৩০০ বছর পর। হকিং এর বাবা ছিলেন একজন জীববিজ্ঞানী এবং মা ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী। মায়ের রক্তে ছিল স্কটিশ রক্ত। হকিং এর বাবা মা উত্তর লন্ডনে থাকতেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর বাবা মা অক্সফোর্ড আসেন। এরপর আবার হকিং হওয়ার পর তাকে নিয়ে উত্তর লন্ডনে চলে যান। এর কারন লন্ডন নিরাপদ ছিলনা যুদ্ধের সময়। ১৯৫০ সালে হকিং এর পরিবার সেন্ট আলবান্সে চলে আসেন এবং হকিং স্কুলে ভর্তি হয়। প্রথমে তিনি মেয়েদের স্কুলে ভর্তি হন। এরপর ছেলেদের স্কুলে চলে আসেন। তাঁর পরীক্ষার ফল ভালই হত।

হকিং এর পরিবারে শিক্ষার মূল্য ছিল। তাই তাঁর বাবার ইচ্ছা ছিল বিখ্যাত ওয়েস্টমিনিস্টার স্কুলে ছেলেকে পড়ানোর। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তাঁর ইচ্ছা পুরন করেননি। স্কুলের বৃত্তি পরীক্ষার দিন হকিং অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই তাকে সেন্ট অ্যালবান্‌সে পড়াশুনা করতে হয়। স্কুলে হকিং তাঁর বন্ধুদের সাথে পড়তে থাকেন এবং বিভিন্ন খেলাধুলায় যোগ দেন। বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ থাকায় বিভিন্ন জিনিস তৈরি করেন। স্কুলে তাঁর নাম ছিল “ আইনস্টাইন”। তাঁর গনিত নিয়ে পড়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তাঁর বাবার ইচ্ছা ছেলে ডাক্তারি পড়বে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কলেজে গনিত না থাকায় হকিং পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়তে শুরু করে।

১৯৫৯ সালে হকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পড়া শুরু করেন। কিন্তু সেসব পড়া তাঁর ভাল লাগতনা কারন পড়াগুলো নাকি অনেক সহজ। হকিং তখন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আগ্রহী হন এবং সেসব কাজে নিজেকে নিয়জিত করেন। স্নাতক পাস করে এরপর হকিং কেম্ব্রিজে স্নাতকোত্তর পড়ার জন্য ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। এর মধ্যেই তিনি মোটর নিউরন অসুখে আক্রান্ত হন। এই রোগে আক্রান্ত হলে পেশি নিয়ন্ত্রণের স্নায়ুগুলো ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারায়।

কর্মজীবনে তিনি রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ শুরু করেন গনভিল অ্যান্ড সাইনাস কলেজে। তিনি কসমোলজি এবং কোয়ান্টাম মধ্যাকর্ষ নিয়ে রিসার্চ করেন। তাঁর সহকারী রজার পেনরোজ এর সাথে তিনি পেনরোজ-হকিং তত্ত্ব প্রমান করেন। তিনি ১৯৭৪ সালে রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হিসেবে যোগ দেন। তিনি অন্যতম কনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন। তিনি ব্ল্যাক হোল নিয়ে অনেক গবেষণা করেন। ১৯৭৪ সালের গবেষণায় তিনি দেখান ব্ল্যাক হোল এক ধরনের তেজস্ক্রিয় বিকিরন নিঃসরণ করে যাকে বর্তমানে হকিং রেডিয়েশন বলা হয়।

সময়ের সাথে সাথে হকিং শারীরিকভাবে দুর্বল হতে থাকেন এবং তাঁর পেশিগুলো শক্তি হারাতে থাকে। ফলে তাঁর জন্য কষ্টকর হয়ে যায় কাজ করা। কিন্তু তিনি থেমে থাকেন নি। তিনি যখন সম্পূর্ণ চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়েন তিনি হুইলচেয়ারে করে কাজ করা শুরু করেন। তিনি কথা বলতেও পারতেন না। তখন বিশেষভাবে তৈরি এক যন্ত্র তাঁর মাথার সাথে যুক্ত করা হয় যা তাকে কথা বলতে সাহায্য করে। আর এইভাবেই তিনি লিখেন তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বই এবং কসমোলজি নিয়ে লিখিত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই “ A Brief History of Time” বা কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস. এই বইতে তিনি বিগ ব্যাং নিয়ে, মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য, কৃষ্ণ গহ্বর ইত্যাদি নিয়ে লিখেছেন। বইটি খুব সহজ ভাষায় লেখা হয়েছে। ফলে যে কেউ বইটি পড়তে পারবে।

হকিং জেন ওয়াইল্ডকে ১৯৬৫ সালের ১৪ জুলাই বিয়ে করেন। তাঁদের ৩টি সন্তান রয়েছে। উপন্যাসিক লুসি হকিং তাঁর মেয়ে। হকিং এর ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। তবে তাঁর পরিবার তাকে নাস্তিক বলেছেন। তিনি ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্যসূত্রঃ https://en.wikipedia.org/wiki/Stephen_Hawking

http://www.hawking.org.uk/about-stephen.html