মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ছাড়া মানুষ বসবাস করতে পারে না। এসব কথা বেশ পুরনো। তাই নিশ্চই মনে প্রশ্ন জাগছে এখন তাহলে এসব বিষয়ে কথা বলছি কেন? বলার কারন তো অবশ্যই আছে।

কারণ এই যে সামাজিকতার বিষয় বস্তুগুলো, এগুলোর সংজ্ঞা কালের স্রোতেবদলে যাচ্ছে।

সামাজিকতার  জন্য বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সৃষ্টি হওয়ায় নতুন দ্বার খুলে গিয়েছে। আধুনিক যুগে ইন্টারনেট আবিষ্কারের পর থেকে শুরু হয়েছে আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগের বিশেষ একটি মাধ্যম ,যার মাধ্যমে যোগাযোগহয়েছে সহজ থেকে সহজতর।

সামাজিকতা বলতে সামাজিক ব্যবহার ,সভ্যতা,পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদিকেই আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলতে বোঝায় যে সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্বারা মানুষ পরস্পরের সাথে সামাজিকতা বজায় রাখে। এক্ষেত্রে শুরুটা ছিল টেলিগ্রাম,ফ্যাক্স, টেলিফোন, মোবাইল, ইমেইল ইত্যাদি। একবিংশ শতাব্দীতে এসে ইন্টারনেটের সহায়তায় পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। মানুষ এই ইন্টারনেটের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছে বিভিন্ন সামাজিকতা রক্ষার যোগাযোগ মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া। এই সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সব কষ্ট কমিয়ে দিয়েছে। কারণ আগে আমরা ইচ্ছা করলেই আপনজনের সাথে যোগাযোগ করতে পারতাম না। কিন্তু এখন তা পারি।

ব্যস্ত পৃথিবী ,ব্যস্ত মানুষ শত দায়িত্ব আমাদের। তার মধ্যে বন্ধু পরিজনদের সাথে কুশল বিনিময়ের সময়টাও নেই এখন। তাই সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন একাবারও এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে কোথাও কি আনসোশ্যাল বা অসামাজিক হয়ে যাচ্ছি ? বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলতেই প্রথমেই মাথায় আসে ফেসবুকের নাম। বর্তমান প্রজন্মের সামাজিক তা যেন আজ সবই ফেসবুকের ওয়ালে সীমাবদ্ধ।

ফেসবুক ছাড়াও ইমো ,ভাইবার,টুইটার,হ্যাং আউটস ইত্যাদি সাইট এবং অ্যাপস বহুল প্রচলিত। একবিংশ শতাব্দীতে এসে যেন সামাজিকতার ধরনই বদলে যাচ্ছে এসকল ইন্টারনেট ভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলোর বদৌলতে। এই ব্যস্ততম সময়ে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে —এমন বার্তাবহন করে ফেসবুক,টুইটার,ইনস্টাগ্রাম ,ইমোসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সৃষ্টি।

 

কিন্তু সমস্যা শুরু হয়েছে ঠিক সেখানে। মানুষ আজ ভুলে গিয়েছে ইন্টারনেটের উপকারিতা সম্পর্কে। ইন্টারনেটকে ছাপিয়ে এখন শুধুই সোশ্যাল মিডিয়ার জয়জয়কার। এমনও মানুষ আছে, যারা ফেসবুক চেনে কিন্তু ইন্টারনেট চেনে না। জন্মের পর থেকে অ্যাপটির জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে। কেনা ব্যবহার করছে এটি !ছোট- বড় সবাই আজ ফেসবুকের রাজ্যে শামিল হয়েছে।

তাই পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে,ফেসবুক বা অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমে কার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হচ্ছি এবং কাদের সঙ্গে জীবনের স্পর্শকাতর বিষয় গুলো শেয়ার করছি ,আমরানিজেরাও জানিনা । ফেসবুকে নিজের বন্ধুর সংখ্যা ঈর্ষণীয় করতে গিয়ে ঢালাও বন্ধুত্ব গ্রহণ করছি। এ বিশাল বন্ধু ভাণ্ডারের মধ্যে হয়তো কিছু লোক আমাদের চেনা,যাদের আমরা বাস্তব জীবনে চিনি-জানি; আর বাকিরা ‘ফেসবুক ফ্রেন্ড’।

ফেসবুক বা অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমে অন্যের পোস্ট করা ছবি বা লেখা দেখে প্রাত্যহিক জীবনে অশান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। কে কী করল ,তা নিয়ে নিজেকে তুলনা করে একদিকে জীবনে হতাশা তৈরি হচ্ছে ,অন্যদিকে আরো জটিল হয়ে উঠছে বাস্তব জীবন। আবার ভার্চুয়াল জগতে অন্যের সামনে ‘শোঅফ ’করতে গিয়ে বাস্তব জীবন প্রাণ হারাতে বসেছে। লাইক,শেয়ারে আটকে পড়ছে নিজের পছন্দ -অপছন্দ। বাস্তব জীবনে সুখী হওয়ার চেয়ে আমরা ভার্চুয়াল জগতে েসুখী দেখানোর পেছনে ছুটছি। এমনটি করে আদতে আমরা শূন্যতার পেছনেই ছুটছি। ফোন হাতে এসব মাধ্যমে কত সময় ব্যয় করছি! অথচ পরিবারকে সময় দেওয়ার বেলায় সেটা সময়ের অপচয়। ইন্টারনেটের যুগে আত্মীয় স্বজনদের বাসায় যাওয়া ,পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া আর মুখোমুখি কথোপকথনগুলো হারিয়ে গেছে প্রায়।

মানুষ তো সামাজিক জীব–কিন্তু এসব কে কি সত্যিই সামাজিকতা বলা যায়?

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে তরুণ ও কিশোর সমাজের। শুরুটা ছিল ব্যস্ততম এই যুগে মানুষ যেন সামাজিকতা বজায় রাখতে পারে, কিন্তু তার বদলে নেতিবাচক প্রভাবই দেখা যাচ্ছে বেশি।

সুস্থভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য কায়িক পরিশ্রমের গুরুত্ব রয়েছে, প্রয়োজন রয়েছে মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করার। দরকার আছে সামাজিকতা বজায় রাখার জন্য প্রাণ খুলে আড্ডা দেবার,  পরস্পরের সাথে ভার্চুয়াল ছাড়াও বাস্তবভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলার। লেখাপড়া,কোচিং,প্রাইভেট ইত্যাদির চাপে খেলাধুলা,আড্ডা দেবার,ঘুরতে যাবারসময়বেরকরাএমনিতেইকঠিন।আরযেটুকুসময়পাওয়াযায়,তাও এখন কেড়ে নিচ্ছে ফেসবুকসহ বিভিন্ন যোগাযোগের মাধ্যম। হাতেহাতেস্মার্টফোনে ক্ষতি ত্বরান্বিত করছে। যখন ভবিষ্যত প্রজন্মের বড় হবার চিন্তা করার কথা,তখন তারা চিন্তা করছে—ফেসবুকসহ অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় নিজেকে কিভাবে সেরা দেখানো যায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যে শুধু নেতিবাচক  প্রভাব ফেলছে ,ব্যাপারটা তা নয়। কিন্ত ুব্যবহার গুণে এগুলো ক্রমেই মানুষের স্বাভাবিক জীবনের অন্তরায় হয়ে উঠছে। আমাদের মনে রাখতে হবে ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের জীবন নয়, বরং  জীবনের চলার পথের ক্ষুদ্র একটা অংশ। এ অংশকে জীবন বানিয়ে ফেললে নিজেদেরই ক্ষতি ডেকে আনা হবে।