আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে পৃথিবী অনেক অন্যরকম ছিল। বিশেষ করে সামাজিক প্রেক্ষাপট তখন অনেক ভিন্ন ছিল। মেয়েরা তখন লেখাপড়ার সুযোগ খুব কম পেত। শুধু লেখাপড়া নয় তাদের চাকরির ক্ষেত্র ছিল খুবই সীমিত। আর উচ্চশিক্ষিত মহিলা তখন পাওয়াই দুষ্কর ছিল। আর ঠিক সেই সময় একজন নারী সব বাধা পেরিয়ে কাজ করেছেন। আর পেয়েছেন বিশ্বজোড়া খ্যাতি। তিনি প্রথম নারী যিনি দু দুবার নোবেল পেয়েছেন তাও ভিন্ন বিষয়ের উপর। তিনি হলেন মারিয়া স্ক্লদভ্‌স্কা ক্যুরি যিনি মেরি ক্যুরি নামে পরিচিত।

১৮৬৭ সালের ৭ নভেম্বর মারিয়া স্ক্লদভ্‌স্কা ক্যুরি পোল্যান্ডের বিখ্যাত শিক্ষক বরিন্সলা, নী বগুস্কা ও ভ্লাদিস্লাও স্ক্লদভস্কির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। খুব ছোটবেলাতেই তাকে অর্থকষ্টে পড়তে হয় কারন পোল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর বাবা যোগ দেন। বাবার কাছে রসায়ন ও পদার্থের উপর পড়াশুনা করেন। অল্প বয়সে তাঁর মা মারা যান। ১০ বছর বয়সে বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি হন।  সেখানে তিনি মেয়েদের জিমনেশিয়াম এ ভর্তি হন। সেই সময়ে মেয়েদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়া খুব কঠিন ছিল। মেরির ক্ষেত্রেও নারী হওয়ার জন্য কোন ভাল কোন নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারেননি। তাই তিনি তাঁর বোনের সাথে একটি ভ্রাম্যমাণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

১৮৯১ সালে মারিয়া পোল্যান্ড থেকে ফ্রান্স এ যান এবং প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং পদার্থ, রসায়ন ও গনিত নিয়ে পড়তে থাকেন। সেখানে তিনি প্রচণ্ড অর্থকষ্টে পরেন। ১৯৮৩ সালে তিনি পদার্থে ডিগ্রী লাভ করেন এবং তিনি অধ্যাপক গাব্রিয়েল লিপম্যানের শিল্পভিত্তিক গবেষণাগারে কাজ শুরু করেন । ১৮৯৪ সালে আরেকটি ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তাঁর সাথে পরিচয় হয় পিয়েরে ক্যুরি যিনি একটি স্কুল এর পদার্থ ও রসায়নের পরামর্শক ছিলেন। মারিয়া এবং পিয়েরে দুজনেই বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। ১৮৯৫ সালের ২৬ জুলাই তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এবং একসাথে গবেষণা শুরু করেন। দীর্ঘ সাইকেল যাত্রা ও বিদেশ ভবনে তারা অবসর উপভোগ করেন এবং পরস্পরকে আরও ভাল করে জানেন।

ক্যুরি দম্পতি তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তাঁরা গবেষণার জন্য নিজেদের কোন গবেষণাগার পাননি। স্কুল অফ ফিজিক্স অ্যান্ড কেমিস্ট্রির এক জায়গায় তাঁরা গবেষণা করেন। ১৮৯৮ সালের জুলাই মাসে ক্যুরি এবং তাঁর স্বামী যৌথভাবে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে একটি মৌলের অস্তিত্ব ঘোষণা করেন যার নাম দেয়া হয় পোলনিয়াম। ক্যুরির জন্মস্থান পোল্যান্ডের পোলনিয়াম প্রতি সম্মান দেখিয়ে এই নাম দিয়েছিলেন।১৯০০ সালে পিয়েরে ক্যুরি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি হন এবং ক্যুরি একোল নরমাল সুপেরিয়র এর প্রথম ফ্যাকাল্টি সদস্য হন। ১৯০৩ সালে মারিয়া, তাঁর স্বামী এবং হেনরি বেকেরেল নোবেল পুরস্কার পান। যদিও প্রথমে মারিয়াকে নোবেল দিতে চায়নি কমিটি। কারন মারিয়া নারী ছিলেন। কিন্তু কমিটির অন্য সদস্য সুইডিশ গণিতবিদ ম্যাগ্নাস গোয়েস্তা মিত্তাগ-লেফফ্লের এবং পিয়েরে ক্যুরির সহযোগিতায় মারিয়া নোবেল পান। তাঁরা নোবেল এর টাকা দিয়ে নিজেদের গবেষণাগার খুলেন। ১৯০৬ সালে পিয়েরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এতে মারিয়া প্রচণ্ড আঘাত পান। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় পিয়েরের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাঁর চেয়ারে মারিয়া কে বসান। মারিয়া ছিলেন পারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা অধ্যাপক। ফ্রান্সে তাঁর বিরোধী লোক ও ছিল। এবং তাকে নানাভাবে হেনস্তা করতে থাকত। কিন্তু এরপর ও মারিয়া কাজ চালিয়ে যান এবং পিচব্লেন্ড থেকে রেডিয়াম আলাদা করার জন্য তাকে ১৯১১ সালে আবার ও নোবেল দেওয়া হয় রসায়নে। মারিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাহায্য করেন। তিনি এক্স রে করার জন্য রেডিওলোজী বিভাগ নিয়ে কাজ করেন।

 

মারিয়া তেজস্ক্রিয় বস্তু নিয়ে কাজ করতেন।তার পকেটে তেজস্ক্রিয় বস্তুর শিশি থাকত। এবং তখন তেজস্ক্রিয় বস্তুর ক্ষতিকর অবস্থা সম্পর্কে তেমন জ্ঞান না থাকায় মারিয়া সাবধানতা অবলম্বন করেন নি। ফলে তিনি রক্তশূন্যতা ছাড়াও বিভিন্ন অসুখে ভুগেন এবং ১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। তাকে তাঁর স্বামী পিয়েরে কুরির পাশে কবর দেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালে সম্মান জানাতে তাদের দেহাবশেষ পান্থিওনে নিয়ে আসা হয়। তিনি একমাত্র মহিলা যিনি নিজ যোগ্যতায় পান্থিওনে সমাহিত আছেন।

 

তথ্যসূত্রঃ

https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF_%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A6%BF