বই। খুবই পরিচিত একটি বস্তু। ৩/৪ বছর বয়স হলেই বইয়ের সাথে ভাল একটি যোগাযোগ শুরু হয়ে যায়। অ, আ, ক, খ থেকেই শুরু বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব্ব। কিন্তু যতই বয়স বাড়তে থাকে অনেকের কাছে এই বই হয়ে পড়ে বিরক্তিকর একটি বস্তু। কারণ বই যে তখন তাদের কাছে শুধুই পরীক্ষায় ভাল নাম্বার পাওয়ার একটি উপায় মাত্র!

কিন্তু বইয়ের উদ্দেশ্য কি শুধু শুধু মাত্র একটি ভালো ফলাফল? অনেকেই বলবেন তা ছাড়া আর কি? হ্যা, তা একাংশে ঠিক। পরীক্ষায় ভাল নাম্বারের জন্য ‘পাঠ্যবই’-ই একমাত্র উপায়। হ্যা, ‘পাঠ্যবই’। এধরণের বইকে পাঠ্যবই-ই বলে থাকি আমরা। কিন্তু এগুলোই সব না। আরও অনেক প্রকারের বই আছে। যেগুলোকে আমরা একথায় বলে থাকি ‘আউট বই’।

আমাদের সমাজে এমন বহু মানুষ আছে, যারা ‘আউট বই’ -কে এক প্রকার তাচ্ছিল্যই করে থাকেন। তাদের মতে যে বই পড়লে পরীক্ষায় নাম্বার আসে না, সেগুলো পড়া যাবে না। আবার অনেকে এও বলে থাকে যে, ‘আউট বই’ মানেই খারাপ। এগুলো পড়তে মানা। আর যদি কেউ পড়ে থাকে তাহলে মনে করা হয় সে দুনিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্টতম কাজটি করে ফেলেছে। কিন্তু আদতেই কি তাই?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ূন আহমেদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ কবি, সাহিত্যিক এবং লেখকদের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন? কবি, সাহিত্যিক এবং লেখকেরা কিন্তু এই ‘আউট বই’-ই লিখে গিয়েছেন। এই ‘আউট বই’ যদি খারাপই হতো, তাহলে তাঁরা এগুলো লিখেছেন কেন? ভেবে দেখুন।

এবার চলুন সমাজের আরেক দিকে ফিরে দেখা যাক। আমাদের সমাজে বহুসংখ্যক মানুষ আছে যারা এই ‘আউট বই’ ছাড়া একদিনও কাটাতে পারে না। তাদের কাছে এটি হচ্ছে পৃথিবীর বাইরে অন্য একটিপৃথিবী। যেখানে রয়েছে অবারিত জ্ঞানের হাতছানি এবং মুখরিত আনন্দধারা। কি নেই সেখানে? যা ইচ্ছে তাই পাওয়া যায়। সত্যিই তাই।

আবার এদেরই বয়সের আরেকটি দলের দেখা পাওয়া যায় সমাজে। তাদের কাছে অবশ্য আউট বই মানে খারাপ কিছু নয়। কিন্তু এই আউট বই পড়ার কোনো মানে তারা কখনো খুঁজে পায় না। তাদের মতে এধরণের বই পড়ার সময় বা ধৈর্য তাদের নেই। একটি বই পড়তে যত সময় লাগে, সে সময়ে বেশ কয়েকটি সিনেমা দেখে ফেলা সম্ভব। তাহলে বই পড়ার দরকারটা কোথায়?

তাদের জন্য আফসোসই হয় বটে। জীবনে তারা অনেক কিছুই পেয়ে যাবে হয়তো, কিন্তু বই পড়ার মাহাত্ম তারা কখনো বুঝতেই পারবে না। পাঠ্যপুস্তক পড়ে মানুষ যতনা জ্ঞান অর্জন করতে পারে, তার চেয়ে ঢের বেশি জ্ঞান অর্জন করা যায় এ ধরণের আউট বই পড়ে।

একটি গল্প, উপন্যাস বা ছোট গল্পপড়ে যে ধরণের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়, তা আপনি নিজের জীবনে অনায়াসেই কাজে লাগাতে পারেন। কারণ এসব অভিজ্ঞতা হয়তো ওই উপন্যাসটিরই একজন মানুষের জীবনের ঘটে যাওয়া কোনো একটি ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারি। যার জীবনের সাথে কোথাও হয়তো আপনার জীবনেরও কিছুটা মিল থেকে যেতে পারে। আবার এমন কিছু তথ্যও পেয়ে যেতে পারেন, যা কখনোই আমাদের সংক্ষিপ্ত আকারের পাঠ্যপুস্তকে পাওয়া যাবে না।

এছাড়াও বই পড়ার হাজারও উপকারিতা তো থেকেই যায়। যেমন ধরুন,

১। এটি মানুষের মনের চাপ কমাতে সাহায্য করে;

২। স্মরণ শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি করে;

৩। বিচারক্ষমতা বৃদ্ধি করে;

৪। মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়;

৫। অন্যের মন পড়তে শেখায়;

৬। শব্দভাণ্ডার উন্নত করে;

৭। নিঃসঙ্গতা দূর করে ইত্যাদি ইত্যাদি।

বই পড়ার উপকারিতা কি কখনো বলে শেষ করা যায়? আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই বই পড়ার কিছু না কিছু উপকারিতা আছেই। যাদের বই পড়ার অভ্যাস নেই তারা একটিবার শুরু করেই দেখুন। বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়তে পারেন। প্রকৃতি সম্বন্ধীয় বই, বিজ্ঞানভিত্তিক বই, ভ্রমণবিষয়ক বই বা ডিটেকটিভ বই। আরও কত কি! প্রথমে যদি খুবই বিরক্তিকর লেগে থাকে তাহলে অল্প অল্প করে পড়ুন। কিছুটা অন্তত পড়ুন। এভাবে প্রতিদিন পড়ুন। দেখবেন আপনি গল্পের ভিতর প্রবেশ করে যাচ্ছেন। আর একবার প্রবেশ করতে পারলেই কেল্লা ফতে! দেখবেন নিজেকে আর বের করে আনতে পারছেন না।