পড়াশোনা ব্যাপারটি অনেকেই বেশ চাপের বলে মনে করে থাকে। এর প্রধান এবং একমাত্র কারণ হচ্ছে এতে তেমন কোনো মজা বা প্রেরণা খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয় ছাত্র-ছাত্রীদের। একারণেই পড়াশোনা নিয়ে সবার এত উদ্বেগ। “Frontiers in Psychology” নামের একটি সাময়িকীতে শিক্ষার সাথে এই প্রেরণার সম্পর্কটিই তুলে ধরা হয়েছে গুরুত্বের সাথে। শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে যত প্রেরণা পাওয়া যায়, ততই তা মজার হয়ে ওঠে। আর এই প্রেরণা যোগানোর জন্য সবচেয়ে ভাল উপায় হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের আউটডোর বা ঘরের বাইরের শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী করে তোলা।

নরওয়েতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব স্ট্যাভেঙ্গার এর শিক্ষাবিষয়ক মনোবিজ্ঞানী Ulrich Dettweiler তার একটি গবেষণাপত্রে বলেছেন, “তরুনদের ক্ষেত্রে তো বটেই, শিশুদের ক্ষেত্রেও ঘরের চেয়ে আউটডোর শিক্ষা কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কাজে লেগে থাকে।”

এই গবেষণার জন্য Dettweiler এবং জার্মানির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখ এবং জোহানেস গুটেনবার্গ ইউনিভার্সিটির সহকর্মীরা মিলে তিনটি উপাদান খুঁজে বের করেছেন যেগুলো ছাত্র-ছাত্রীরা কোনো কিছু শিখতে তাদের প্রয়োজন বলে মনে করে থাকে। উপাদান তিনটি হল: ১। পারদর্শিতা বা সক্ষমতা, ২। ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ৩। সম্পৃক্ততা বা সংশ্লিষ্টতা।

‘আত্ম-সংকল্প’তত্ত্ব অনুযায়ী এগুলো হল নিজের ভিতর শিক্ষা গ্রহণের প্রেরণা জাগানোর জন্য মানসিকভাবে সৃষ্ট কিছু মৌলিক চাহিদা।

প্রায় ৩০০ ছাত্র-ছাত্রীকে নিয়ে একটি গবেষণাকাজ চালানো হয়। যেখানে তাদের এক সপ্তাহের জন্য একটি আবাসিক বিজ্ঞান শিক্ষার আয়োজন করা হয়। এই গবেষণার আগে ও পরে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটি প্রশ্নোত্তর পর্বেরও আয়োজন করা হয়। এই প্রশ্নোত্তর পর্বের উদ্দেশ্য ছিল, কত কার্যকরীভাবে বিজ্ঞান শিক্ষার এই আয়োজন তাদের সেই তিনটি মৌলিক উপাদানগুলো পূরণ করতে পারে।

প্রশ্নগুলো ছিল:

১। ছাত্র-ছাত্রীরা কি নিজেদের এই কাজে পারদর্শী বলে মনে করেছে? তারা কি সত্যিই পূর্বে এই কাজে ভাল ছিল?

২। তারা কি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় নিজেদের স্বাধীন বলে মনে করেছিলো?

৩।এই শিক্ষা কার্যক্রমে তারা কত ভালভাবে তাদের শিক্ষক এবং সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছে?

Dettweiler এর মতে পারদর্শিতা বা সক্ষমতা হল এই তিনটি উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক, তা ঘরেই হোক বা বাইরে। কিন্তু প্রতিটি উপাদানই ঘর থেকে বাইরে বেশি কার্যকর।

বিজ্ঞান শিক্ষার এই আয়োজনের পরে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে সাক্ষাতকার করে গবেষণাটি বেশ কিছু গুণগত উপাত্ত খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছে। Dettweiler মতে, ছাত্র-ছাত্রীরা ঘরের বাইরে যেভাবে বাস্তব উদাহরণ দিয়ে কোনো একটি জিনিস খুব ভালভাবে শিখতে পারে, তা ঘরে বসে কোনোভাবেই করা সম্ভব না। যেমন, এই গবেষণায় বাইরে শিক্ষা কার্যক্রম চলাকালীনছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন উদ্ভিদের নাম এবং সাথে সাথে সেগুলোর বৈশিষ্ট্য যেভাবে মনে রাখতে পেরেছে, তা কখনোই ঘরে শিক্ষা গ্রহণের সময় তারা মনে রাখতে পারতো না। কারণ, বাইরে থাকাকালীন তারা একেকটি উদ্ভিদের নাম জেনেছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে পড়াশোনা করেছে। যে কারণে তাদের শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সময়ও কম লেগেছে।

এসকলের পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক চাপের বিষয়টিও উঠে এসেছে। তাদেরই আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, বাইরে শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে মানসিক চাপও অন্যান্য সময়ের থেকে অনেকাংশে কম থাকে। Dettweiler এবং তারই পূর্বের কিছু সহকর্মীরা মিলে দুটি দলের শিশুদের মধ্যে কর্টিসোল নামে মানসিক চাপের একটি হরমোনেরদৈনিক মাত্রা পরিমাপ করেছিলেন। সেখানেও প্রমাণিত হয়েছিলো যে, যারা বাইরে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছিলো, তাদের কর্টিসোল হরমোন স্বাভাবিকভাবেই নিঃসৃত হয়েছিলো। কিন্তু যারা ঘরে থেকে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলো, তাদের কর্টিসোল হরমোন স্বাভাবিকভাবে নিঃসৃত হতে পারেনি। এর মানে হচ্ছে, তাদের মানসিক চাপ বেশি ছিল।

তাই শিশুকাল থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের কিছুটা সময় ঘরের বাইরে নিয়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দেয়া উচিৎ। পুরোদিনের জন্য বা ঘন ঘন হয়তো বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু যখনই সুযোগ হবে তখনই তাদের এই সুযোগটি করে দেয়া আমাদের কর্তব্য।

তথ্য সুত্র

https://www.psychologytoday.com/blog/brain-waves/201802/the-benefits-learning-outdoors